২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে নাটকীয় সব মুহূর্ত, ভিএআরের (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) প্রথম ব্যবহার এবং ইউরোপীয় দলগুলোর আধিপত্যের জন্য। ৩২ দলের এই মহাযজ্ঞের শেষ হাসি হেসেছিল ফ্রান্স, যারা দিদিয়ের দেশমের নেতৃত্বে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে নেয়।
টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই একের পর এক অঘটন ফুটবলপ্রেমীদের বিস্মিত করে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন জার্মানির বিদায়ে। গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে পড়ে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা, যা বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে বিবেচিত হয়।
নকআউট পর্বেও ছিল উত্তেজনার কমতি নেই। শেষ ষোলোতে ফ্রান্সের বিপক্ষে রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে ৪-৩ গোলের ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। একই পর্বে স্পেনকে টাইব্রেকারে হারিয়ে স্বাগতিক রাশিয়া সৃষ্টি করে বড় চমক।
তবে আসরের সবচেয়ে আলোচিত রূপকথার গল্প লিখেছিল ক্রোয়েশিয়া। লুকা মদরিচের নেতৃত্বে দলটি ধারাবাহিকভাবে শক্ত প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নেয়। যদিও শিরোপা জয়ের শেষ বাধা টপকাতে পারেনি তারা।
পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ফ্রান্স ছিল ভারসাম্যপূর্ণ ও সুসংগঠিত একটি দল। অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের নিখুঁত সমন্বয়ে গড়া এই স্কোয়াডে কিলিয়ান এমবাপ্পে নিজেকে বিশ্ব ফুটবলের নতুন তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। পাশাপাশি অঁতোয়ান গ্রিজম্যানের সৃজনশীলতা, পল পগবার মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং দলের সামগ্রিক কৌশল প্রতিপক্ষদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
সেমিফাইনালে বেলজিয়ামকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে ফ্রান্স। অন্যদিকে ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনাল নিশ্চিত করে ক্রোয়েশিয়া। তবে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে ৪-২ গোলের জয়ে ফরাসিরাই শেষ পর্যন্ত নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে।
১৫ জুলাই মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে বৃষ্টির দিনে আয়োজিত ফাইনালে দেখা যায় গোলের বন্যা। আক্রমণ আর প্রতি-আক্রমণের লড়াইয়ে ক্রোয়েশিয়া প্রাণপণ চেষ্টা করলেও ফ্রান্সের ক্লিনিক্যাল ফিনিশিংয়ের কাছে ৪-২ ব্যবধানে হার মানে তারা। এমবাপ্পে পেলের পর দ্বিতীয় কনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল করার রেকর্ড গড়েন।
শিরোপা ফ্রান্স জিতলেও ব্যক্তিগত অর্জনে উজ্জ্বল ছিলেন অন্য দেশের ফুটবলাররা। টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জেতেন ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদরিচ। ৬ গোল করে গোল্ডেন বুট পান ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন। আর সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার গোল্ডেন গ্লাভস ওঠে বেলজিয়ামের থিবো কোর্তোয়ার হাতে।
২০১৮ বিশ্বকাপ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নামের ভার নয়, মাঠের লড়াই আর সঠিক পরিকল্পনাই শেষ কথা। এমবাপ্পে নামক এক নতুন মহাতারকার উত্থান আর ফ্রান্সের সোনালী প্রজন্মের বিশ্বজয়ের মাধ্যমে ইতিহাসের পাতায় এই আসরটি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।