মোঃ কায়সার হামিদ (জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার)
অবিশ্বাস্য ! অসাধারণ ! ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ইংল্যান্ড বনাম ফ্রান্স ম্যাচে যা হলো , তা ইতিহাসে অতুলনীয়। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ইংল্যান্ড ৬-৪ গোলে হারালো ফ্রান্সকে। গুণে গুণে ১০ গোলের ম্যাচে হ্যাট্রিক করলেন ইংল্যান্ডের বুকায়ো সাকা। বদলী হিসেবে মাঠে নেমে জুড বেলিংহ্যাম আসরে নিজের সপ্তম গোলের দেখা পেলেন। গড়লেন একটি বিশ্বকাপ আসরে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। ইতোপূর্বে ১৯৮৬ সালে গ্যারি লিনেকার আর ২০১৮ সালে ৬টি করে গোল করেছিলেন। দুজনেই জিতেছিলেন বিশ্বকাপের ‘গোল্ডেন বুট’। কিন্তু ৭ গোল করেও বেলিংহ্যাম ‘গোল্ডেন বুট’ পাচ্ছেন না। পাবেন কি করে ? ম্যাচে ফ্রান্সের পক্ষে জোড়া গোল করেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে।
বিশ্বকাপের মতো আসরে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ সেমিফাইনালে হেরে যাওয়া দুই দলের সম্মান রক্ষার লড়াই ছাড়া কিছু না। তবে ব্যক্তিগত অর্জনের ক্ষেত্রে স্থান নির্ধারণী ম্যাচ ব্যাপক ভূমিকা রাখে। এবার যেমন এমবাপ্পের জন্য ম্যাচটি হয়ে এলো ‘পয়মন্ত’ হিসেবে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২২টি গোলের মাইলফলক গড়লেন ফরাসী উইঙ্গার। পেছনে ফেলেছেন ২১ গোল করা লিওনেল মেসিকে। চলতি আসরেও ১০ গোল করে টপকে গেছেন ৮ গোলের মালিক আর্জেন্টিনার অধিনায়ককে। ( মেসির সামনে ফাইনালে এমবাপ্পেকে পিছনে ফেলার সুযোগ রয়েছে। এই লেখা প্রকাশ হবে ২০ জুলাই। আগেই জানা হয়ে যাবে এমবাপ্পে আর মেসির মধ্যে গোলযুদ্ধের ফলাফল।)
বিশ্বকাপের শুরু থেকে একাধিক লেখায় বলেছি, ফ্রান্স দলটি দুর্দান্ত। কিন্তু রক্ষণে দুর্বলতা আছে। বিশেষ করে রক্ষণের সাথে মাঝমাঠের সমন্বয়ের অভাব দলটিকে ডোবাতে পারে। বাস্তবে সেটাই হয়েছে। স্পেন আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দুটি রক্ষণের ভুল আর মাঝমাঠের কার্যকারিতার অভাবে হেরেছে ফ্রান্স। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমার্ধে চার গোল হজম করেছে তারা , মনেই হয় নি ডিফেন্স বলে কিছু আছে। এক সময় মনে হচ্ছিল, বড় ব্যবধানে ম্যাচ হারতে চলেছে ফ্রান্স। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে অবিশ্বাস্য কামব্যাকে জিততে না পারলেও উপহার দিয়েছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ। যতদূর জানি, অস্ট্রিয়া ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যকার ১৯৫৪ সালের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটিতে মোট ১২টি গোল হয়েছিল (অস্ট্রিয়া ৭-৫ সুইজারল্যান্ড)। সেই ম্যাচের পর হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশী গোল হলো ইংল্যান্ড আর ফ্রান্সের খেলায়। ১৯৮২ সালে হাঙ্গেরি ১০-১ গোলে হারিয়েছিল এল সালভেদরকে, কিন্তু সেটা ছিল একপেশে ম্যাচ।
এমবাপ্পের প্রশংসা যত করা যায় কম হয়ে যাবে। স্পেনের বিপক্ষে গোল পান নি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমার্ধে নিশ্চুপ ছিলেন। জ্বলে উঠলেন দ্বিতীয়ার্ধে। গড়লেন বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। গোল্ডেন বুটের দাবিও জোরালো করে রাখলেন। ২৭ বছরের এমবাপ্পে ২২টি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেই ২২ গোল করলেন। ২০৩০ বিশ্বকাপে এমবাপ্পের বয়স হবে ৩১। অন্তত পাঁচটি বিশ্বকাপ খেললেও এমবাপ্পে রেকর্ডটি কোথায় নিয়ে যাবে, ধারণা করা মুশকিল।
ফ্রান্সের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের জয় দেখে শুধু আফসোস বাড়বে সবার। কোচ থমাস তুঁশেলের ভুলগুলো পীড়া দেবে ইংলিশদের। হ্যাট্রিকম্যান বুকায়া সাকোর মতো খেলোয়াড়কে তিনি ব্যবহার করেন নি আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালে। এগিয়ে থাকা অবস্থায় উইঙ্গার আর মধ্যমাঠের খেলোয়াড় বসিয়ে রক্ষণে অতিরিক্ত মনোযোগ দেয়ার মাশুল দিয়েছে তুঁশেলের ইংল্যান্ড। যাই হোক, ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর এবারেই প্রথম তৃতীয় হয়ে সেরা সাফল্য পেয়েছে ইংল্যান্ড। এই জন্য তুঁশেল ধন্যবাদ পেতেই পারেন। অন্যদিকে , ফ্রান্স কোচ দিঁদিয়ের দেশমের বিদায় নিতে হলো টানা দুই পরাজয়ে। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী আর ২০২২ সালের রানার-আপ কোচ হিসেবে দেঁশম চিড়স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার ফ্রান্স উয়েফা নেশনস লিগও জিতেছে । ২০২৬ বিশ্বকাপে টপ ফেভারিট ছিল ফ্রান্স। তবে, টপ ফেভারিটদের বিশ্বকাপ জয়ের কোন রেকর্ড নেই। ফ্রান্সও সেই ধারাই রক্ষা করেছে শুধু।
যাই হোক , পাঠকের হাতে এই লেখা পৌঁছুনোর আগেই জানা হয়ে যাবে বিশ্বকাপের ফাইনালের ফলাফল। কে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, কে জিতেছে গোল্ডেন বুট আর গোল্ডেন বল অজানা থাকবে না কিছুই। তবু নিয়মরক্ষার জন্য আর একটি দিন পাঠকের সামনে আমাকে লেখা নিয়ে হাজিরা দিতে হবে বিশ্বকাপের সার্বিক মূল্যায়নের জন্য। কষ্ট লাগছে। পুরো ৪০টি দিন লেখার মাধ্যমে ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এর পাঠকদের যে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, সেটা অনুভব করবো ভীষণভাবে। আজ বিদায়ের আগে শুধু একটি আশাবাদ ব্যক্ত করতে চাই, প্রিয় দল জয়ী হলে আমরা অবশ্যই উদযাপন করবো। কিন্তু সেটা যেন সহনশীল পর্যায়ে থাকে। বিরোধী দলের সমর্থকদের সাথে কোন বিরূপ আচরণ আমরা করব না, জন্ম দেব না অনাকাক্সিক্ষত কোন ঘটনার- যার জন্য আমাদের লজ্জিত হতে হয়। সবার জন্য শুভকামনা।