ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর গ্রাহকদের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং ২০১৭ সালের পূর্বের প্রকৃত মালিকদের নিকট মালিকানা হস্তান্তরের জোর দাবি জানিয়েছে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’।

আজ শুক্রবার (১৭ জুলাই ২০২৬) বিকাল ৪টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ফোরামের পক্ষে এই দাবি তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুরনবী মানিক।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশের সর্ববৃহৎ শরীআহভিত্তিক এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির স্থিতিশীলতা ও আমানতের নিরাপত্তার স্বার্থে সচেতন গ্রাহকবৃন্দ গত ২৪ মে ২০২৬ থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে আসছেন। এর অংশ হিসেবে মানববন্ধন, অর্থ মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদান, সংবাদ সম্মেলন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি পেশ করা হয়েছে।

এছাড়া গত ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর জনাব কবির আহমেদ ও ড. ইসমাইল হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করে ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়।

ফোরাম নেতৃবৃন্দ জানান, সরকারের পক্ষ থেকে তারল্য সংকট মোকাবিলায় কিছু ফান্ড সরবরাহ এবং বিএবি (BAB) ও এবিবি (ABB)-এর পক্ষ থেকে প্রকৃত মালিকদের হাতে দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ এলেও সুশাসন ও মূল সংকট নিরসনে এখন পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

সংবাদ সম্মেলন থেকে ইসলামী ব্যাংকের সুশাসন ও গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে ৭ দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়:

১. পেশাদার পর্ষদ গঠন: অংশীজনদের আলোচনার ভিত্তিতে দ্রুত সৎ, যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে।

২. প্রকৃত মালিকানা হস্তান্তর: ২০১৭ সালে অপব্যবহারের মাধ্যমে কেড়ে নেওয়া ব্যাংকের বৈধ মালিকানা অবিলম্বে আদি ও প্রকৃত উদ্যোক্তা-মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।

৩. বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন: বিদায়ী সরকারের সহায়তায় এস আলমসহ যারা হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে, তাদের বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে।

৪. স্থিতিশীলতা ও অপপ্রচার রোধ: বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংকবিরোধী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার বন্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

৫. লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত: টাস্কফোর্সের মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা এবং অর্থঋণ আদালতে বিশেষ সেল গঠন করে লুটেরাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ব্যাংকের দেনা শোধ করতে হবে।

৬. আইন সংশোধন ও বিচার: ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৮/ক ধারা বিলুপ্ত করে ব্যাংকিং খাতে লুটেরাদের স্থায়ীভাবে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে।

৭. সংসদীয় বক্তব্য প্রত্যাহার: জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রীদের দেওয়া বিভ্রান্তিকর বক্তব্য অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।

‎ফোরামের নেতারা বলেন, ইসলামী ব্যাংক কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা বিশেষ পরিবারের সম্পদ নয়। এটি কোটি কোটি আমানতকারীর অর্থ ও বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি জাতীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান। তাই ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের মতে, বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকে যেভাবে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের মধ্য থেকে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা উচিত।

‎সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বক্তব্যেরও সমালোচনা করা হয়। ফোরামের দাবি, ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত উদ্যোক্তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না—এ ধরনের বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগ না করে এমন মন্তব্য করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য সমীচীন নয় বলেও তারা উল্লেখ করেন।

চলমান আন্দোলন প্রসঙ্গে অধ্যাপক নুরনবী মানিক জানান, বর্তমানে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং চলমান এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে আগামীকাল শনিবারের (১৮ জুলাই ২০২৬) ঘোষিত গ্রাহক মহাসমাবেশটি আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্ষদ পুনর্গঠন করা না হলে শিগগিরই আরও কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হবে বলে হুশিয়ারি দেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে গ্রাহক, আমানতকারী, উদ্যোক্তা ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা উপস্থিত থেকে ব্যাংকটিকে ২০১৭ সালের পূর্বের স্থিতিশীল ও আস্থাশীল জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।