যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন স্টেডিয়ামে ফুটবলপ্রেমীরা আরও একটি শ্বাসরুদ্ধকর ও রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের সাক্ষী হলো। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের শেষ বত্রিশের (রাউন্ড অব ৩২) অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে এশিয়ার শক্তিশালী দল জাপানকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ১৬ নিশ্চিত করেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়ার পর দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তের ইনজুরি টাইমে জয় ছিনিয়ে নেয় সেলেসাওরা। ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল। ব্রাজিল ম্যাচের শুরু থেকেই বল দখল এবং আক্রমণের গতিতে আধিপত্য বিস্তার করে। তবে কাউন্টার অ্যাটাকনির্ভর কৌশলে খেলে ম্যাচের ২৯ মিনিটে টেক্সাসের গ্যালারি স্তব্ধ করে দেয় জাপানের ‘ব্লু সামুরাই’রা। ব্রাজিলের রক্ষণভাগের একটি দুর্বল পাস থেকে বল কেড়ে নিয়ে দারুণ দক্ষতায় ডান পায়ের ফিনিশিংয়ে লক্ষ্যভেদ করেন জাপানের মিডফিল্ডার কাইশু সানো। ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকেই প্রথমার্ধের খেলা শেষ করে ব্রাজিল।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই কৌশলে পরিবর্তন আনেন ব্রাজিল কোচ। লুকাস পাকুয়েতাকে তুলে মাঠে নামানো হয় তরুণ ফরোয়ার্ড এন্ড্রিককে। এই পরিবর্তনের পর ব্রাজিলের আক্রমণভাগের ধার আরও বেড়ে যায়। ফলশ্রুতিতে ম্যাচের ৫৬ মিনিটে কাক্সিক্ষত সমতাসূচক গোলের দেখা পায় তারা। গ্যাব্রিয়েল মাগালাহিসের নিখুঁত ক্রস থেকে দুর্দান্ত এক হেডে বল জালের ঠিকানায় পাঠান অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার কাসেমিরো। এটি ছিল ব্রাজিলের জার্সিতে তার ১০ম আন্তর্জাতিক গোল। ১-১ সমতায় ফেরার পর জয়সূচক গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে সেলেসাওরা। ভিনিসিয়াস জুনিয়রের একটি দুর্দান্ত শট বারে লেগে ফিরে আসলে গোলবঞ্চিত হয় ব্রাজিল। জাপানি গোলরক্ষক জায়ন সুজুকিও বেশ কয়েকটি দুর্দান্ত সেভ করে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিলেন। যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়াতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন বদলি খেলোয়াড় গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি।
ম্যাচের যোগ করা সময়ের শেষ মুহূর্তে (৯০+৬ মিনিটে) ব্রুনো গিমারায়েসের পাস থেকে জাপানের রক্ষণভাগকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান মার্টিনেল্লি। এই নাটকীয় গোলের সাথে সাথেই উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো স্টেডিয়াম। ২-১ গোলের দুর্দান্ত এক মহাকাব্যিক জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ব্রাজিল। আগামী ৫ জুলাই শেষ ১৬-র লড়াইয়ে নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রাত দুইটায় মাঠে নামবে নেইমার-মার্টিনেল্লিরা। সেই ম্যাচে ব্রাজিলের মুখোমুখি হবে আইভরিকোস্ট-নরওয়ের মধ্যকার বিজয়ী দল। অন্যদিকে দুর্দান্ত লড়াই করেও শেষ মুহূর্তের হতাশা নিয়েই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো এশিয়ার পরাশক্তি জাপানকে।
ম্যাচ শেষে জাপানের কোচ হাজিমে মরিয়াসু ম্যাচে দলের লড়াইয়ের প্রশংসা করে বলেন, “আমাদের এবং শীর্ষ দলগুলোর মধ্যকার ব্যবধান এখন ঘুচে আসছে। নিশ্চিতভাবেই ব্রাজিল একটি বিশ্বমানের শীর্ষ দল, তবে আমরা তাদের সমানে সমানে টক্কর দিয়েছি এবং খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম।” ম্যাচের আগে জাপানের খেলোয়াড়দের কিছু মন্তব্য এবং টুর্নামেন্ট জয়ের লক্ষ্যের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি যোগ করেন, তারা বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছিলেন যে সেরাদের হারানোর সামর্থ্য জাপানের রয়েছে। তবে শেষ মুহূর্তের গোলে পরাজয় সত্ত্বেও দলের এই লড়াকু মানসিকতা জাপানি ফুটবলের ধারাবাহিক অগ্রগতিরই প্রমাণ।
ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি এই ম্যাচটিকে টুর্নামেন্টের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা হিসেবে দেখছিলেন। প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়ার পরও দল যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তাতে শিষ্যদের মানসিক শক্তির প্রশংসা করেছে ব্রাজিলীয় টিম ম্যানেজমেন্ট। ৯০+৬ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির নাটকীয় জয়সূচক গোলের পর আনচেলত্তি দলের খেলোয়াড়দের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খেই না হারিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতায় দারুণ সন্তোষ প্রকাশ করেন। নেইমারকে ম্যাচে না নামানো প্রসঙ্গেও ব্যাখ্যা দিয়ে কোচ বলেছেন, নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ সমতায় না ফিরলে তিনি নেইমারকে মাঠে নামাতেন। অতিরিক্ত সময়ের কথা ভেবে নেইমারকে বেঞ্চে রেখে দেওয়া হয় বলে জানান আনচেলত্তি। তবে শেষ পর্যন্ত ম্যাচে তা প্রয়োজন হয়নি।