মনোয়ারা বেগম

মাওলানা রফিউদ্দীন আহমাদ ইসলামী আন্দোলনের এক নিরব ও নিবেদিত প্রাণ দায়িত্বশীল ছিলেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ইসলামী আন্দোলন, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন এবং একসময় দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন। এছাড়া বৃহত্তর ফরিদপুর ও নোয়াখালী অঞ্চলে জামায়াতের আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে বিশেষ অবদান রাখেন।

মাওলানা রফিউদ্দিন আহমদের জন্ম ১৯৪৩ সালে ফেনী জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। শৈশব থেকেই তিনি ইসলামী শিক্ষা অর্জনের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষার পর তিনি কওমি মাদরাসা ধারায় উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং কুরআন, হাদীস, ফিকহ ও ইসলামী চিন্তাধারায় গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ইসলামী সমাজ গঠনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন এবং ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে দাওয়াতী কাজ শুরু করেন।

আমাদের বিয়ে হয় ১৯৭৩ সালে। তিনি ছিলেন আমার বড় চাচার ছেলে। আর আমি ছিলাম ইসলামী আন্দোলনের পথে আত্মোৎসর্গকারী একজন শহীদের কন্যা। সে কারণেই আমার শাশুড়ি বিশেষ আগ্রহ নিয়ে তাঁর ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ের ব্যবস্থা করেন। তখন তাঁর বয়স ছিলো ৩১ বছর, আর আমার বয়স মাত্র ১৮ বছর। এ সময় তিনি স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ফরিদপুর জেলা শাখার প্রথম আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল তখনকার নয়; বরং ছাত্রজীবন থেকেই তিনি এ পথের একজন নিবেদিত কর্মী ছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি তৎকালীন ছাত্রসংঘের বৃহত্তর নোয়াখালী (নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী) জেলার সভাপতি ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং সংগঠনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।

আমাদের বিয়ের পর তাঁকে বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার আমীর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে তিনি নোয়াখালী শহরে একটি সাধারণ টিনশেড বাসা ভাড়া নেন। সেই বাসার অর্ধেক অংশ ছিলো সংগঠনের অফিস, আর বাকি অর্ধেক ছিলো আমাদের বসবাসের জায়গা। অফিস ও বাসার মাঝখানে ছিলো একটি সাধারণ বাঁশের বেড়া। বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঘরের ভেতর দেখা যেত বলে আমি ও তিনি মিলে পুরোনো খবরের কাগজ লাগিয়ে সেগুলো ঢেকে দিয়েছিলাম। দুই অংশে যাতায়াতের জন্য যে দরজার মতো ফাঁকা জায়গা ছিলো, সেটি একটি সাধারণ চটের পর্দা দিয়ে আচ্ছাদিত করা হয়েছিলো।

সে সময় আমাদের আর্থিক অবস্থা ছিলো অত্যন্ত সীমিত। সংগঠনের দায়িত্ব, দাওয়াতি কাজ এবং আদর্শিক সংগ্রামই ছিলো তাঁর জীবনের প্রধান ব্যস্ততা। ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ বা ঘর সাজানোর প্রতি তাঁর কোনো আগ্রহ ছিলো না। একদিন আমাদের বাসায় সফরে এসেছিলেন তৎকালীন অঞ্চল পরিচালক ও কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল মরহুম ইউনুস সাহেব। তিনি ঘরে প্রবেশ করে সেই চটের পর্দাটি দেখে মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, “রফিউদ্দিন ভাই, এ পর্দাটা তো দেখতে ভালো লাগছে না। এখানে একটা কাপড়ের পর্দা লাগালে ভালো হয়।”

তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন, “এটা দিয়েই চলবে।”

এ সংক্ষিপ্ত উত্তরের মধ্যেই তাঁর জীবনদর্শন যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু কেনা বা নিজের জন্য সামান্য বিলাসিতার প্রতিও তাঁর কোনো আকর্ষণ ছিলো না। তিনি যা ছিলো, তা দিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে শিখেছিলেন।

ইউনুস সাহেব তাঁর স্বভাব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, রফিউদ্দিন ভাই নিজে থেকে নতুন পর্দা কিনবেন না। তাই তিনি আর কিছু না বলে নিজেই বাজারে গিয়ে একটি কাপড়ের পর্দা কিনে আনলেন। সেদিন বিকেলেই আমাদের বাসায় এসে সেটি লাগিয়ে দিয়ে গেলেন। ঘটনাটি হয়তো খুব ছোট; কিন্তু এর মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি বড় দিক ফুটে ওঠে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে, মিতব্যয়ী ও দুনিয়াবিমুখ একজন মানুষ। নিজের প্রয়োজনকে সর্বদা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রেখে তিনি আদর্শ, সংগঠন এবং দ্বীনের কাজকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

এ তো তাঁর জীবনের বিশাল অধ্যায়ের সামান্য একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। আমাদের দাম্পত্য জীবনের পরবর্তী দীর্ঘ ৫২ বছরে তাঁর যে গৌরবময় জীবনসংগ্রাম, আদর্শনিষ্ঠা, আত্মত্যাগ এবং ইসলামী আন্দোলনের জন্য নিরলস সাধনা, তা বলে বা লিখে শেষ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আপাতত আমি শুধু আমার চোখে দেখা তাঁর জীবনের শেষ ১৬ বছরের কিছু স্মৃতি এবং ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ঘরে বন্দী অবস্থায় থেকেও ইসলামী আন্দোলনের জন্য তাঁর অবিচল নিষ্ঠা ও আদর্শিক দৃঢ়তার কিছু দিক তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সময়ানুবর্তী, পরিপাটি ও সুশৃঙ্খল একজন মানুষ। চারিত্রিক সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বের মাধুর্য ছিলো তাঁর জীবনের অন্যতম অলংকার। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর এক কাপ চা পান করে তিনি পড়াশোনায় বসে যেতেন। সকাল দশটা পর্যন্ত একনাগাড়ে অধ্যয়ন করার পর নাশতা করতেন। নাশতার টেবিলেও তিনি আমাদের জন্য শিক্ষা ও উপদেশের পরিবেশ সৃষ্টি করতেন। বিশেষভাবে তিনি শাশুড়ি ও পুত্রবধূদের প্রতি এ উপদেশ দিতেন যে, কেউ যেন কারও গীবত না করি। এটি কেবল তাঁর মুখের উপদেশ ছিলো না; বরং তিনি নিজেই এর জীবন্ত উদাহরণ ছিলেন। বিয়ের পর থেকে আমি কখনো তাঁর মুখে কোনো মানুষের গীবত শুনিনি।

তাঁর ব্যবহার ছিলো অত্যন্ত কোমল ও মার্জিত। তিনি কখনো উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতেন না। পরিবারের সকল সদস্যের খোঁজখবর রাখতেন এবং বিশেষভাবে খেয়াল করতেন সবাই ঠিকমতো খেয়েছে কি না। সারাদিন ঘরের ভেতর চলাফেরা করলেও তাঁর দৃষ্টি থাকতো সংসারের প্রতিটি বিষয়ে। কোথাও অপ্রয়োজনে বাতি জ্বলছে কি না, পানির কল খোলা রয়েছে কি না কিংবা কোনো কিছু অপচয় হচ্ছে কি নাÑ এসব বিষয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন।

তাঁর বাহ্যিক জীবনাচরণেও ছিলো অনাড়ম্বরতা ও মিতব্যয়িতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি জীবনে কখনো একসঙ্গে দু’টির বেশি পাঞ্জাবি, পায়জামা কিংবা লুঙ্গি ব্যবহার করতেন না। একটি কাপড় যতদিন ব্যবহারযোগ্য থাকতো, ততদিনই সেটি ব্যবহার করতেন। নতুন কাপড় উপহার হিসেবে পেলেও প্রয়োজন না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো ভাঁজ করা অবস্থায়ই রেখে দিতেন। আজও আমার মনে পড়ে, জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি যে চশমাটি ব্যবহার করেছেন, সেটির বয়স ছিলো প্রায় ২২ বছর। চশমাটি তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন মুহতারাম আমীরে জামায়াত শহীদ অধ্যাপক গোলাম আযম।

আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনামলে তিনি মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটিয়েছেন। জুলুম-নির্যাতনের সে কঠিন দিনগুলো অতিক্রম করার পরও তাঁর মুখে কখনো অভিযোগ বা হতাশার ছাপ দেখিনি। কারাগার থেকে প্রথম সাক্ষাতের সময় তিনি নিজের কষ্টের কথা না বলে হাসিমুখে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনি ভালো আছেন তো?” আমি পাল্টা প্রশ্ন করেছিলাম, “আপনি কেমন আছেন? কারাগারের জীবন কেমন কেটেছে?” উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “আমি ভালো আছি কি খারাপ আছি, আর আমার কারাজীবন কেমন কেটেছেÑ এসব কথা আমি শুধু আমার আল্লাহর কাছেই বলব।” এরপর আর কখনো তিনি আমাদের সঙ্গে তাঁর কারাজীবনের কষ্টের কথা আলোচনা করেননি। ধৈর্য, তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার এমন দৃষ্টান্ত আমি খুব কমই দেখেছি।

জীবনের শেষ দু’বছর তিনি বুকের তীব্র ব্যথায় ভুগেছেন। এমন অবস্থা হয়েছিলো যে, তিনি ভাতের জাউ ছাড়া কিছুই খেতে পারতেন না। তরকারি তো দূরের কথা, সাধারণ সবজিও তাঁর জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছিলো। ধীরে ধীরে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। সেখানে টানা ১৪ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি তাঁর রবের ডাকে সাড়া দিয়ে ইন্তিকাল করেন।

তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোর একটি স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ে গভীরভাবে অঙ্কিত হয়ে আছে। সিসিইউতে তাঁর সঙ্গে শেষ দিকের কথোপকথনের এক পর্যায়ে আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বলেছিলাম, “আপনি যদি আমাদের ছেড়ে চলে যান, তাহলে আমরা কোথায় থাকবো? আমাদের জন্য তো কোনো ঘরবাড়ি বা জাগতিক সম্পদ রেখে যাচ্ছেন না। অনেকেই তো সন্তান-পরিবারের জন্য অনেক কিছু রেখে যায়।”

আমার কথা শুনে তিনি অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে, অবিচল বিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন, “যারা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।”

আজও তাঁর সে কথাগুলো আমার কানে প্রতিধ্বনিত হয়। জীবনের শেষ প্রহরেও তিনি আমাদের জন্য ধন-সম্পদের উত্তরাধিকার রেখে যেতে চাননি; বরং রেখে গেছেন ঈমান, তাওয়াক্কুল, ধৈর্য, আদর্শের প্রতি অবিচলতা এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতার এক অমূল্য শিক্ষা। তাঁর জীবনের এই শিক্ষাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ, সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।

লেখিকা : মরহুমের স্ত্রী