কামাল হোসাইন

আকাশটা যেন বিশাল এক রাজ্য, সেখানে থাকে কত কত মেঘ। কেউ সাদা, কেউ ধূসর, কেউ আবার বজ্রপাতের মতো ভয়ংকর। সবাই যে যার কাজের মধ্যে থাকে। তাদের কেউ বৃষ্টি দেয়, কেউ ঝড় তোলে, কেউ বজ্রপাতের সঙ্গে গর্জন করে ওঠে।

এই রাজ্যের এক কোণে থাকে এক ছোট্ট মেঘ, নাম তার মিনি। সে ছিল একেবারে তুলোর মতো হালকা। সামান্য বাতাসেই যেন উড়ে যায়!

বড় মেঘেরা যখন জোরে গর্জন করে নিচে নেমে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে, মিনি তখন ভয়ে চুপটি করে লুকিয়ে থাকে নীল আকাশের এক কোণে।

আর মনে মনে বলে, আমি এতটাই ছোট যে, আমার পক্ষে তো কিছুই করা সম্ভব নয়!

একদিন সকালে সূর্য মামা উঁকি দিলেন সোনালি হাসি নিয়ে।

তিনি খেয়াল করে দেখলেন, মিনি একা একা বসে আছে মন খারাপ করে।

তিনি মিনিকে ডেকে বললেন, কী হলো রে মিনি? আকাশটা আজ কত সুন্দর, তবুও তুই এত মন খারাপ করে আছিস কেন রে বাছা?

মিনি মাথা নিচু করে বলল, আমি তো অন্য মেঘেদের মতো বড় নই। গর্জন করতে পারি না, বজ্রপাত আনতে পারি না। বৃষ্টি হয়ে ঝরতে পারি না। সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। তখন আমার খুব খারাপ লাগে। তাই...

মিনির কথায় সূর্য মামা মৃদু হাসলেন।

আর বললেন, মিনি, মনে রাখিস, সবার কাজ একরকম নয়। তুই ছোট মেঘ, তুইও এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

গর্জন করলেই যে সব, এমন ভাবার কিছু নেই। অনেক সময় তোর মতো ছোট ছোট মেঘের দয়ার বৃষ্টির ফোঁটাতেই পৃথিবী সবুজ হয়। ফুলেফুলে ভরে ওঠে।

মিনি চুপ করে শুনল তার কথা।

মনের ভেতর যেন এক টুকরো উজ্জ্বল আলো ঢুকে গেল সূর্যের কথায়।

তখন পাশ দিয়ে যাচ্ছিল এক দুষ্টু বাতাস ভাই। তার নাম ফুঁ।

সে হেসে বলল, এই মিনি, ভয় পাস কেন? আমি তোর পাশে আছি! চাইলে তোকে নিয়ে যাব দূর পাহাড়ে। যেখানে বৃষ্টি পড়ার অপেক্ষায় আছে শুকনো বন। যাবি?

মিনি তার মনে দ্বিধা নিয়ে বলল, কিন্তু আমি তো পারব না, ফুঁ ভাই। আমার ভয় করে!

ফুঁ হেসে ফেলল। বলল, সাহস না করলে কেউ কিছুই পারে না, বুঝলি?

ভয়মিশ্রিত মনে মিনি মুখ টিপে একটুখানি হাসল। তাতে মনে যেন সাহস জমল খানিকটা।

সেদিন দুপুরে পৃথিবীটা যেন পুড়ে যাচ্ছিল রোদের তুমুল তেজে।

নদী শুকিয়ে গেছে, মাঠে ফাটল ধরেছে, পাখিরা ছায়া খুঁজে ফিরছে দিকে দিকে।

গ্রামের ছোট ছোট শিশুরা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলছে, হে মেঘ মামা, একটু বৃষ্টি দাও না! আমরা যে গরমে মরোমরো অবস্থা।

শিশুদের আকুতিভরা সেই ডাক কানে ভেসে এলো মিনির। ওর ছোট্ট বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল।

মনে মনে উচ্চারণ করলÑ এই মুহূর্তে আমি যদি সত্যিই ওদের জন্য কিছু করতে পারতাম!

এ সময় সূর্য মামার কথা মনে পড়ল মিনির।

‘দয়ার বৃষ্টির ফোঁটাতেই পৃথিবী সবুজ হয়। ফুলেফলে ভরে ওঠে।’

এটা ভাবার পর মিনির মনের মধ্যে একটা উদ্যম জেগে উঠল। সে কিছু একটা করতে চায়।

এ সময় ফুঁ বাতাস মিনির পাশেই ছিল। মিনির মনের কথা যেন সে বুঝতে পারল। বলল, চল মিনি, এখনই সময়। আমার বিশ্বাস, তুই পারবি।

চলল মিনি ফুঁ ভাইয়ের সঙ্গে। গেল সেই দূর পাহাড়ে। সেখানে গিয়ে মিনি চোখ বন্ধ করল। আর তার পরপরই বুকের ভেতর জমে থাকা ছোট্ট জলবিন্দুগুলো এক এক করে নেমে এলো নিচে।

এক ফোঁটা, দুই ফোঁটাÑ তারপর অগণিত ফোঁটা ঝরে পড়ল পৃথিবীর বুকে।

বৃষ্টি এলো ঝুমঝুম করে! সে কী বৃষ্টি! কুল ভাসানো বৃষ্টি।

শুকনো মাঠ ভিজে উঠল, নদীর বুক ভরল, গাছেরা সবুজ পাতা মেলে নেচে উঠল।

ছোট্ট শিশুরা বৃষ্টি ছুঁয়ে হাত তুলে চিৎকার করে বলল, মেঘ মামা এসেছে! বৃষ্টি পড়ছে! আহ, কী শান্তি!

মিনি নেমে আসা বৃষ্টির মধ্য দিয়ে হেসে দিল। তার বুক ভরে উঠল এক অন্যরকম আনন্দে।

সূর্য মামা তখন একটু মেঘ সরিয়ে সেই মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে বললেন, দেখলি মিনি? তুই পেরেছিস। সাহস মানে শুধু চিৎকার নয়, সাহস মানে অন্যের জন্য কিছু করতে পারা।

মিনি মৃদু হেসে বলল, তাহলে আর আমি ছোট নই, মামা। আমার ভেতরেও আছে বৃষ্টির শক্তি। আমিও ঝরতে পারি ঝরঝর ঝমঝম করে।

সূর্য মামা বললেন, সত্যিই তো, প্রত্যেক শিশু-মেঘই বড় হতে পারে। যদি সে ভালোবাসে পৃথিবীকে।

আকাশে তখন রঙধনু ছড়িয়ে পড়েছে।

মিনি হাসিমুখে তার রঙের ভেতর ভেসে বেড়ায়, আর মনে মনে বলে, আমি ছোট হলেও বড় কাজ করতে পারি!