• কমেছে বরাদ্দ ও খাত সংস্কারের নুতন উদ্যোগ
  • ২০৩০ সালে উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা

জাতীয় সংসদে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ খাতের জন্য সুখবর নেই। ঘোষিত বাজেটে বরাদ্দ কমেছে বিদ্যুৎ খাতের। প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ কমানো হয়েছে এ খাতে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ ছিল ২০ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা। যদিও পরবর্তীতে সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ১৫হাজার ৫৩০ কোটি টাকা।

জানা গেছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা অর্থাৎ নতুন অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়ছে ৩৯৩ কোটি টাকা। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এমন বরাদ্দ প্রস্তাব করেছেন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুতে বরাদ্দ ছিল ২০ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুতের উন্নয়নে বরাদ্দ প্রস্তাব ছিল ২৯ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা। যা সংশোধিত বাজেটে কমে ২১ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা করা হয়।

বাজেট বক্তৃতায় মন্ত্রী বলেছেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি এবং এখাতের সীমাহীন দুর্নীতি, লুপাপট অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিদ্যুৎ খাতে হরিলুট ও অর্থ পাচার হয়েছে। বেশকিছু মেগা প্রকল্পে এক তরফা ও বিতর্কিত শর্ত যুক্ত থাকায় বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা আমাদের উপর চেপেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট হলেও নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি।

আমরা বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম দুর্নীতি প্রতিরোধ করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়েছে। অদক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছি। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ শতাংশ গ্যাস ভিত্তিক। গ্যাসের মজুদ কমে যাওয়ায় আমদানিকৃত গ্যাস দিয়ে উৎপাদন করা ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে ২০৩০ সালে উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে ৩০ শতাংশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে :

বিগত সরকারের অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি, দুর্নীতি, লুটপাট ও অনিয়মের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে এবং ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিপুল অর্থ অপচয় ও পাচার হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেন, বিগত সরকারের অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি এবং এ খাতে সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিদ্যুৎ খাতে হরিলুট ও অর্থ পাচার হয়েছে।

বিগত সরকারের সময়ে সম্পাদিত বেশ কিছু মেগা প্রকল্পে একতরফা ও বিতর্কিত শর্ত যুক্ত থাকায় বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা আমাদের উপর চেপে বসেছে। এ খাতে বার্ষিক ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। বর্তমানে দেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯শ’ ১৯ মেগাওয়াট (আমদানি ও অন-গ্রিড নবায়নযোগ্যসহ) হলেও নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনো নিশ্চিত হয়নি।

দেশের বিদ্যুৎ খাতের অভ্যন্তরীণ সংকট নিয়ে অর্থমন্ত্রী বিগত সরকারের নীতি ও ব্যবস্থাপনার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি, দুর্নীতি, লুটপাট এবং চরম অব্যবস্থাপনার কারণেই আজ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্রভাড়ার নামে বিদ্যুৎ খাতের বিপুল অর্থ অপচয় করা হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া কিছু মেগা প্রকল্পে একতরফা ও বিতর্কিত শর্তের কারণে বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে যে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা তৈরি হয়েছে, তা এখনো দেশের মানুষকে বহন করতে হচ্ছে। আর এসব কারণেই বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে বার্ষিক ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ আমদানি ও অন-গ্রিড নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও, ভুল নীতির কারণে এখনো জনগণের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার :

সংকট ও অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বহুমুখী পরিকল্পনা ও সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অর্থমন্ত্রী জানান, খাতের সব পর্যায়ে দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রতিরোধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিবিড় মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পাশাপাশি অদক্ষ ও পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ বা আধুনিকায়ন করা, সর্বনিম্ন ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং পূর্বের বিতর্কিত ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো পুনরায় পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্কের আধুনিকায়ন, এবং সিস্টেম লস কমিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহকে আরও নির্ভরযোগ্য করার কাজ চলছে।

উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা :

সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অনুযায়ী, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে। মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ২০ শতাংশ আসবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই মেগা প্রকল্পের প্রথম ইউনিট থেকে আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে ১ হাজার ২শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে।

আমদানি নির্ভর জ্বালানি থেকে বের হয়ে আসতে হবে

দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার এখন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। আগামী তিন বছরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের মাধ্যমে ২৭০ কিলোমিটার ভূতাত্ত্বিক জরিপ, ৭০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি এবং ৭০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক জরিপ সম্পন্ন করা হবে। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই সময়ের মধ্যে নতুন ৬৯টি কূপ খনন এবং ৩১টি পুরনো কূপের ওয়ার্কওভার (মেরামত) করা হবে। পাশাপাশি নতুন অনুসন্ধান রিগ কেনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। সমুদ্রাঞ্চলে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের গতি বাড়াতে পিএসসি কাঠামো সংশোধন করে নতুন করে “বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড” ঘোষণা করা হয়েছে।

জ্বালানি অবকাঠামো বহুমুখীকরণ :

জ্বালানি আমদানিতে একক কোনো উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে সরকার কৌশলগত বহুমুখীকরণ নীতি গ্রহণ করেছে। মহেশখালীতে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি নতুন আরও একটি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়টি এখন সরকারের পর্যালোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজও এগিয়ে চলছে।

দেশের অভ্যন্তরে ৬০১ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পাইপলাইনের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়াতে চট্টগ্রাম বা উপকূলীয় শিল্পাঞ্চলে ধাপে ধাপে ৫০ লাখ মেট্রিক টন সক্ষমতার একটি নতুন তেল শোধনাগার নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

উৎসে কর কর্তনের প্রস্তাব :

বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার বর্তমান ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রিফাইনারি কর্তৃক জ্বালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যবসায়িক ব্যয় কমাতে সহায়তা করবে এবং খাতটির কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে ভূমিকা রাখবে।