রাজধানীতে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবিতে শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতদের র্যালি আজ ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার বিকেলে শাহবাগ চত্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। র্যালি পূর্ব সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার।
সভাপতির বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরয়ার বলেন, জুলাই বিপ্লবের বেনিফিসিয়ারি হচ্ছে বিএনপি। সেই বিএনপির মন্ত্রী এমপিরা জুলাইকে আননেসেসারি (অপ্রয়োজনীয়) বলে জুলাই বিপ্লবকে অস্বীকার করছে এবং বিপ্লবীদের সাথে গাদ্দারি করছে। বিএনপির কাছে জুলাই আননেসেসারি হলেও জনগণের কাছে জুলাই নেসেসারি (প্রয়োজনীয়)।
তিনি আরও বলেন, ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদে স্বাক্ষর করার পর থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বিএনপি কোনোদিন বলেনি গণভোট সংবিধানে নেই, গণভোটের অধ্যাদেশ রাষ্ট্রপতি জারি করতে পারে না। কিন্তু নির্বাচনের পর ক্ষমতায় বসে বিএনপি দাবি করছে, গণভোট সংবিধানে নেই, রাষ্ট্রপতি গণভোটের অধ্যাদেশ জারি করতে পারে না! অথচ রাষ্ট্রপতির জারিকৃত একই অধ্যাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট একইদিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি, রাষ্ট্রপতির সেই অধ্যাদেশে সংসদ নির্বাচন বৈধ দাবি করে গণভোটকে অবৈধ দাবি করছে! এটি সরাসরি জাতির সঙ্গে প্রতারণা। এই প্রতারণা উপযুক্ত জবাব জাতি যথাসময়ে দেবে।
এমপি-মন্ত্রীদের বেতন বন্ধ না থাকলেও জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কেন বন্ধ প্রশ্ন রেখে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই মুছে দেওয়ার চেষ্টা করলে জাতি আপনাদেরকেই মুছে দিতে পারে। যারাই জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তাদের পরিণতি ভয়াবহ হয়েছে। আগামীতেও যারা জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে, প্রতারণা করবে তাদের পরিণতিও ভয়াবহ হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা ভিন্নধর্মালম্বীদের প্রতি বরাবরই শ্রদ্ধা নিবেদন করি। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের রথযাত্রা শহীদ মিনার হয়ে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের কাছে অনুরোধ জানানোয় আমরা পূর্ব নির্ধারিত স্থান পরিবর্তন করে শাহবাগ চত্বরে সমাবেশ ও র্যালির আয়োজন করেছি। কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্র তাদের দেশে একটা ধর্ম ব্যতিত অন্য কোনো ধর্মের স্বীকৃতিই দিতে চায় না। তারা মানুষকে মসজিদে নামাজ পড়তে দেয় না, ঈদের নামাজ পড়তে দেয় না।
সমাবেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন বিএনপিকেই করতে হবে। কীভাবে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে সেই পথ বিএনপিকেই জনগণের সামনে নিয়ে আসতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা চাই অবিলম্বে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। গণহত্যার বিচার এবং গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন ব্যতিত ১১ দলীয় ঐক্য ঘরে ফিরবে না। সরকার আন্তরিকতার সাথে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে ১১ দলীয় ঐক্য কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন বলেন, চব্বিশের জুলাই শহীদদের রক্তের ওপর দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। শহীদদের স্বপ্ন ছিল বৈষম্যহীন ও ন্যায় বিচারের নতুন বাংলাদেশ। শহীদদের আকাঙক্ষায় জুলাই সনদ তৈরি করা হয়েছে। গণভোটের মাধ্যমে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণ জুলাই সনদের পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় বসেই গণভোটের রায় উপেক্ষা করে পুরোনো ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছে।
আমার বাংলাদেশ পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, জাতিসংঘ জুলাই শহীদের সংখ্যা ১৪০০ বলেছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত জুলাই শহীদদের চূড়ান্ত তালিকা করতে পারেনি। ফলে শহীদের প্রকৃত সংখ্যা অজানা রয়ে গেছে। শহীদদের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করতে একটি কমিটি গঠন করে দ্রুত জুলাই শহীদদের চূড়ান্ত তালিকা করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী বলেন, শহীদদের রক্তের দাগ এখনো শুকিয়ে যায়নি কিন্তু শহীদদের রক্তের ওপর দিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার শহীদদের রক্তের সাথে বেঈমানি করছে। তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে পুরোনো ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছে। গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জাগপার মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, স্বৈরাচারের পতন হয়েছে কিন্তু ইনসাফ কায়েম হয়নি, বাস্তবতা হচ্ছে এক জালিম গেছে আরেক জালিম এসে ক্ষমতার মসনদে বসেছে। তিনি গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি জানিয়ে বলেন, শহীদদের রক্তের দায় শোধ করতে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, দিল্লির গোলামি করে এদেশে কোনো সরকার টিকেনি, টিকবে না। জনগণের মতের বিরুদ্ধে গেলে আওয়ামী লীগের পরিণতি ভোগ করতে প্রস্তুত হতে হবে। তিনি বলেণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবি মানতে বিএনপি যেভাবে বাধ্য হয়েছে একইভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নেও বিএনপি বাধ্য হবে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিনের পরিচালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ দেলাওয়ার হোসেন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্যও ঢাকা মহানগরী উত্তরে সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আহ্বায়ক এআরএম জাফরুল্লাহ চৌধুরী, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, শহীদের পিতা মোশারফ হোসেন, জুলাইযোদ্ধা কামরুল ইসলাম প্রমুখ।
সমাবেশ শেষে, জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবিতে শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতদের র্যালি শাহবাগ চত্বর থেকে শুরু হয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) গেইটে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। র্যালিতে জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত জুলাই যোদ্ধারা এবং ১১ দলীয় ঐক্যের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।