• মহাসমাবেশের দাবি গণভোটের রায় কার্যকর করতে হবে -মিয়া গোলাম পরওয়ার

ময়মনসিংহ সংবাদদাতা: বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের জন্যে যেকোনো কঠিন থেকে কঠিনতর পথ অবলম্বন করতে আমরা কুণ্ঠিত হবো না ইনশাআল্লাহ। সংগ্রামী দেশবাসী আমরা সারাদেশের মানুষের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছি, কাছে কাছে যাচ্ছি আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য নয়। আমরা এদেশের মানুষের সম্মান এবং গৌরব রক্ষা করার জন্য দাবি নিয়ে আমরা ঘুরছি। বাংলাদেশের মানুষ বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই দিনে তাঁরা জুলাই বিপ্লবের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে গণভোটে হ্যাঁ ব্যালটে ভোট দিয়েছিল। গণভোটে হ্যাঁ এবং অভূতপূর্ব এবং অনেক বড় ব্যবধানে ৭০% ভোট পেয়ে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেছে। আমরা লক্ষ্য করি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দীর্ঘ প্রায় পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ দুই দলীয় শাসন ব্যবস্থার যাতাকলে নিষ্পেষিত হয়ে আসছে। পর্যায়ক্রমে ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা ক্ষমতার মসনদকে কুক্ষিগত করে বাংলাদেশের মানুষের উপার জুলুম নির্যাতন এবং বৈষম্যের স্টিমরোলার পরিচালনা করে ছিল। এদেশের মানুষের উপর গুম, খুন, হত্যাকাণ্ডসহ গোটা দেশের মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস তুলে ফেলেছিল। বাংলাদেশের মানুষকে বোকারাম সাজিয়ে শেখ হাসিনা গণতন্ত্রকে নতুনভাবে এদেশের মানুষের সামনে সংগঠিত করবার অপচেষ্টা চালিয়ে ছিল।

গতকাল শনিবার বিকেলে নগরীর রেলওয়ে কৃষ্ণচূড়া চত্বরে ১১ দলীয় ঐক্যের ময়মনসিংহ বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আল্লামা মামুনুল হক এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ময়মনসিংহ অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মো. শাহাবুদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর আল্লামা মামূনুল হক বলেন, আপনাদের মনে থাকবার কথা শেখ হাসিনা বলতো উন্নয়নের গণতন্ত্র। অর্থাৎ দেশের মানুষের মতামতের প্রয়োজন নাই। দেশের ভোটাধিকারের প্রয়োজন নাই। তাই ২০১৪ সালের বিনা ভোটের সরকার, ২০১৮ সালের রাতের ভোটের সরকার, ২০২৪ সালে আমি আর ডামি মার্কা নির্বাচন করে জনগণের ভোটাধিকারকে ছিনতাই করে বাংলার অধিকারকে সে তার পায়ের নিচে পিষ্ট করেছিল। আর শুধুমাত্র বিএনপি ঈদের চাঁদ উঠবে অপেক্ষা করেছিল। কবে চাঁদ উঠবে ঈদ আসবে এরপর আন্দোলন হবে। পনেরো বছর পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বের ব্যর্থতার ফসল হিসেবে এদেশে যুবকেরা প্রাণ দিয়েছে। এদেশের মানুষেরা জীবন দিয়েছে, রক্ত দিয়েছে ২০১৩ সালে শাপলা চত্ত্বরে, রক্ত দিয়েছে আল্লাম সাঈদীকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসির রায় দেয়াতে। রক্ত দিয়েছে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে। রক্তের সাগর পেরিয়ে ৩৬ শে জুলাই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলার মানুষ নতুন করে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে এনেছে।

বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের মানুষ দ্বিতীয় গণতন্ত্র গঠন করবার জন্য ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবীদের নেতৃত্বে আন্দোলন করলো। জুলাই বিপ্লবীরা ঘোষণা করলো ১৯৪৭, ১৯৭১ আর ২০২৪ এর আন্দোলনের ভিত্তিতে আগামীর বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। বাংলাদেশের মানুষ চেয়েছিল তাদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের মানুষ চেয়েছিলো বৈষম্যের বিলোপ হবে। বাংলাদেশের মানুষ চেয়েছিল ফ্যাসিবাদ চিরতরে বিতাড়িত হবে এবং ফ্যাসিবাদের দুয়ার বন্ধ হয়ে যাবে। ফ্যাসিবাদের দুয়ার বন্ধ করার জন্য বৈষম্যবিরোধ করার জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে নয় মাস পর্যন্ত ৩৩টি রাজনৈতিক দল মিলেমিশে ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়নের জন্য প্রস্তাবনা তৈরি করল। সনদ প্রণীত হলো, জুলাই সনদ নামে সেটি স্বাক্ষরিত হলো।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে যখন সেই জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হবে এবং ঐকমতের ভিত্তিতে আগামীর সুন্দর বাংলাদেশের জন্য নতুন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ে উঠবে, সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের দিকে বাংলার মানুষ যাত্রা করবে ঠিক সেই সময় বিএনপির অন্তবর্তীকালীন সরকারে ঘাপটি মেরে বসে থাকা কিছু চাটুকার আর গোলামের সঙ্গে রাতের অন্ধকারে চুক্তি করে অন্তহীন প্রতারণার মাধ্যমে জুলাই সনদকে কলঙ্কিত করে দিয়েছে। আমরা বলতে চাই তোমরা যে প্রতারণা আশ্রয় নিয়েছো ৩২টি রাজনৈতিক দলকে অন্ধকারে রেখে বিএনপি এবং অন্তবর্তীকালীন সরকারের কিছু লোক জোগসাজস করে তারা নোট অফ ডিসেন্টের ভিত্তিতে আগামীতে ক্ষমতাসীন দল তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবার যেই চোরাই পথ তোমরা আবিস্কার করেছ আমি বিএনপিকে বলতে চাই, তোমাদের কল্যাণকামী হিসেবে বলতে চাই এই চোরাই পথ দিয়ে যদি তোমরা বাংলাদেশের মানুষের সংস্কারের অভিপ্রায়কে মুছে ফেলবার চেষ্টা করো এটা হবে তোমাদের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এই মহাসমাবেশের প্রধান দাবি গণভোটের গণরায়কে কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয় বলেছি আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের প্রতিদিনের নিত্যদিনের জীবন প্রবাহের জন্য জনদুর্ভোগ, অশান্তি ধোবায়িত হচ্ছে, এই দুর্ভোগকে দূর করতে হবে। এখন ক্ষমতায় যারা আছেন বিএনপির উনারা তো সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদের একেবারে বিরোধী দলে কারা আছেন কি নেই দেখার দরকার নেই। উনারা বলে আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন দিয়ে উনারা দেশ চালাতে চান। ঠিক আছে আপনারা নির্বাচিত হয়ে যেভাবেই হোক আপনারা এসে গেছেন। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করেছেন, ফলাফল ম্যানুপুলেশন করেছেন। বিএনপির অভ্যন্তরে লুকানো কিছু গুপ্ত উপদেষ্টা ছিল যারা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে বিরোধী দলের অনেক নেতাকে ইচ্ছে করে হারিয়ে দিয়েছে। তানাহলে আমরা ১১ দল ১৮০ মত আসন পেতে যাচ্ছিলাম। ফলাফল ঘোষণা হচ্ছিল কিছুক্ষণ পর সকল মিডিয়াতে ফলাফল ঘোষণা বন্ধ করে দেয়া হলো। রহস্যজনকভাবে ফলাফল ম্যানুপুলেশন করে আমাদেরকে অর্থাৎ বিরোধী দলে ঠেলে দেয়া হলো। সরকার একজন উপদেষ্ঠাতো পরবর্তীকালে স্বীকারই করেছেন। জামায়াতে ইসলামী উদ্দেশ্য করে বলেছেন আমরা এই দলকে মেইন স্ট্রিমে আসতে দেইনি। আমরা মানে কি উনার সাথে উনি ছাড়া আরো অনেক লোক ছিলো। আমাদের বলা লাগবে না আস্তে আস্তে বেড়িয়ে আসবে। চুরি যে করে তার মধ্যে একটা চোর চোর মনোভাব থাকে। গল্পে গল্পে কোন না কোন সময় বলে ফেলে। আমাদের আমীরে জামায়াত সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বলেছিলেন ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কারা জড়িত আমরা নাম বলবো না এক সময় ঠিকই বেরিয়ে আসবে। ঠিকই এক ভদ্র মহিলা বলে ফেলেছেন। অনেক প্রশ্ন অনেক কষ্ট সত্ত্বেও আমরা এই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছি একটা কারণে। সতেরো বছরে রাজনীতিতে সংঘাত, সহিংসতা, হানাহানি, জ¦ালাও পোড়াও, হরতাল ধর্মঘট, খুনাখুনি, রক্তারক্তি, বিরোধী দলের উপর দমন পীড়ন কবর দিয়ে জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম। আমরা যদি এই ফলাফল বয়কট করতাম আরেকটি রক্তঝড়া আন্দোলনের সূচনা আমরা করতে পারতাম। কিন্তু আমাদের নেতা সংসদে বলেছিলেন দেশের রাজনীতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে মানুষের জীবনের শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অনেক কষ্ট বুকে নিয়ে আমরা এই ফলাফলকে মেনে নিয়েছি। তার অর্থ এই নয় আপনারা জোর করে ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিং করেছেন, ভোট ছিনতাই করেছেন এটাকে কিন্তু আমরা স্বীকৃতি দিচ্ছি না। আপনারা কিন্তু ইতিহাসে ভোটচোর হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টি'র (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভুঁইয়া বলেন, আমরা ১১ দলীয় ঐক্য নির্বাচনের পর থেকেই গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছি। আমরা এই দেশের জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে যে ৭০% মানুষ গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিয়েছিলেন সেই জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁদের দাবি আদায়ের জন্য কষ্ট করে সবাই একত্রিত হয়েছেন। আমরা নির্বাচনের আগে দেখেছি যিনি এখন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন একটি নির্বাচনী সভায় অনুরোধ করে বলেছিলেন আপনারা সবাই গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিবেন। কিন্তু নির্বাচনের পরে সেই গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য যেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ হওয়ার কথা সেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ তাঁরা নিলেন না। যে গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেয়ার অনুরোধ করেছিলেন সেটা তিনি আর কোথাও কোন মুখ খুললেন না।

আমরা সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই দেশের স¦ার্থে কিন্তু সরকার যদি দেশের জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে, বিরোধী দল হিসেবে সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হতে পারে। আমরা আশা করবো তাঁদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। তাঁরা জুলাই সনদ, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করবে। তাঁরা দেশ পরিচালনায় জনগণমুখী হয়ে দেশ পরিচালনা করবে। যদি তাঁরা সেটা করে এবং সেই সদিচ্ছা তাঁরা দেখায় তাহলে আমরা সবাই মিলে তাদেরকে সহযোগিতা করবো। কিন্তু যেই পথে তাঁরা এগুচ্ছে এই পথ বাংলাদেশকে কোনো ভালো দিকে নিয়ে যাবে না।

বিভাগীয় সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি'র সাংগাঠনিক সম্পাদক মাওলানা আবু তাহের খান, বাংলাদেশ লেবার পার্টি'র চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, প্রেসিডিয়াম সদস্য এডভোকেট আওরঙ্গজেব বেলাল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম ভূঁইয়া, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হেদায়েতুল্লাহ হাদী, নেত্রকোণা-৫ আসনের এমপি মাসুম মোস্তফা, শেরপুর-১ আসনের এমপি হাফেজ রাশেদুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ময়মনসিংহ শাখার সভাপতি ও ময়মনসিংহ-২ আসনের এমপি মুফতি মুহাম্মাদুল্লাহ, ময়মনসিংহ-৬ আসনের এমপি অধ্যক্ষ কামরুল হাসান মিলন, ময়মনসিংহ জেলা জামায়াতের আমীর মো. আব্দুল করিম, জাতীয় যুব শক্তির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান রাকিব, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ময়মনসিংহ জেলার সিনিয়র সহ-সভাপতি মুফতি সারোয়ার হোসাইন, সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম, ময়য়মনসিংহ মহানগর জামায়াতের আমীর মাওলানা কামরুল আহসান এমরুল, এনিসিপ'র ময়মনসিংহ জেলা সেক্রেটারি জসিম উদ্দিন, মহানগর সেক্রেটারি একরামে এলাহী খান সাজ, ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর আসাদুজ্জামান সোহেল, শেরপুর জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা হাফিজুর রহমান, নেজামে ইসলাম ময়মনসিংহ জেলা শাখার নায়েবে আমীর মাওলানা মিজানুর রহমান ফরিদী, জামালপুর জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা আব্দুস সাত্তার, নেত্রকোণা জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা সাদেক আহমেদ হারিস, খেলাফত মজলিস ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ মাও. নজরুল ইসলাম, এনসিপি ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি এডভোকেট এটিএম মাহবুবুল আলম, কিশোরগঞ্জ জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক রমজান আলী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলামী পার্টির আমীর মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সুবহানী সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।