স্টাফ রিপোর্টার

ঢাকার গণ্ডি পেরিয়ে সারাদেশে উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে সংক্রমণের গতি উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর বড় ঢেউ আঘাত হানতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৭ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১৩ হাজার ৬৪৪ জন এবং মারা গেছেন ৪৪ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ৬১ দশমিক ৪ শতাংশ পুরুষ ও ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ নারী। তবে মৃত্যুর ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। মৃতদের ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ নারী এবং ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ পুরুষ।

শুধু জুলাই মাসের প্রথম ২৭ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৫৪০ জন, যা জুন মাসের মোট আক্রান্তের (২ হাজার ৯০৭) দ্বিগুণেরও বেশি। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ২৬ জন। জুনে এ সংখ্যা ছিল ১৩। ডেঙ্গু সংক্রমণের অন্যতম হটস্পর্টে পরিণত হয়েছে বরিশাল বিভাগ ও চট্টগ্রাম বিভাগ। পিছিয়ে নেই খুলনা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগও।

চলতি বছর বরিশাল বিভাগে আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৯৮ জন এবং মারা গেছেন ৫ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে মারা গেছেন চারজন এবং আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৩৬৭ জন। এরপরই আছে খুলনা বিভাগ। এই বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৭৪৯ জন এবং মারা গেছেন ছয়জন। ময়মনসিংহ বিভাগে আক্রান্ত ৫৪৯ জন এবং মারা গেছে ৫ জন। রাজশাহীতে মারা গেছেন একজন এবং আক্রান্ত ৪৭০ জন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ডেঙ্গুর যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। দেশের প্রান্তিক এলাকার দুর্বল স্বাস্থ্যকাঠামো এবং অপর্যাপ্ত মশক নিধন কার্যক্রমের কারণে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হবে। ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বছর মারা যাওয়া ৪৪ জনের মধ্যে ২৭ জনই ঢাকার বাসিন্দা। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি এলাকায় মারা গেছেন ১৫ জন এবং ঢাকা উত্তরে ছয়জন।

সংক্রমণের দিক থেকেও ঢাকা পিছিয়ে নেই। ঢাকা দক্ষিণে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৯২৫ জন, উত্তরে ১ হাজার ৩৭৪ জন এবং ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৭৬৮ জন। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে বিভিন্ন জেলা শহর থেকে আসা রোগীর সংখ্যা। এলাকায় চিকিৎসা সেবা ভালো না হওয়ায় ঢাকায় ছুটছেন তারা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট আক্রান্তের মধ্যে ২ হাজার ৪৫২ জনের বয়স ১৫ বছর বা এর কম, যা মোট রোগীর প্রায় ১৯ শতাংশ। অর্থাৎ আক্রান্ত প্রতি পাঁচজনের একজন শিশু। এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সি ৭৮৩ শিশু আক্রান্ত হয়েছে, যা মোট রোগীর প্রায় ৫ শতাংশ। ছয় থেকে ১০ বছর বয়সি আক্রান্ত ৭৫৯ জন এবং ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সি ৯২০ জন।

এছাড়া ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সি আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ৩৪। সব মিলিয়ে ৩০ বছরের কম বয়সি রোগী ৭ হাজার ৪৮৬। সেইসঙ্গে ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সি ২ হাজার ৫৫৪ জন। ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সি ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ২৩৯ জন, যা মোট ৪৫ শতাংশ।

ডেঙ্গুতে যারা মারা গেছেন তাদের বেশিরভাগ তরুণ। প্রাণ হারানো ৪৪ জনের মধ্যে ১ থেকে ২০ বছর বয়সি আটজন, ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সি মারা গেছেন ১১ জন এবং ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সি ছয়জন। অর্থাৎ ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সি ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর বড় একটি অংশ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘চলতি মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে এবং মৃত্যুর সংখ্যাও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বাড়তেই থাকবে। এর অন্যতম কারণ আবহাওয়ার ধরণ। বৃষ্টি হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকছে। আবার মাঝে মাঝে রোদ উঠছে ও বৃষ্টি হচ্ছে। অর্থাৎ জলবায়ুর পরিবর্তনের একটি বড় প্রভাব রয়েছে। এর পাশাপাশি বড় কারণ হলো অপরিচ্ছন্নতা। আমাদের আশপাশের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কোনো ধরনের উন্নতি হয়নি।’

মুশতাক হোসেন আরো বলেন, ‘মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য বর্তমান সরকার যা কাজ করছে, তা অতীতের সরকারগুলোর মতোই গতানুগতিক। জনগণকে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করে ধারাবাহিক ও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য যে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ দরকার, তা অর্জন করা সম্ভব নয়। ফলে এই ক্ষেত্রে কোনো বড় পরিবর্তন দেখা যাবে বলে মনে হয় না এবং পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘গত মাসের চেয়ে চলতি মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেশি হয়েছে এবং আগামী মাসে তা আরও বাড়বে। এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আগামী নভেম্বর পর্যন্ত চলার আশঙ্কা রয়েছে। আর আক্রান্ত বাড়ার পাশাপাশি মৃত্যুর সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়বে।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, ‘আমাদের দেশের চিকিৎসা সেবা পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। শুধু বড় বড় হাসপাতালের আইসিইউ সুবিধা নিয়ে চিন্তা করা হচ্ছে। কিন্তু তৃণমূল বা কমিউনিটি লেভেলে দ্রুত রোগী শনাক্ত করে তাকে প্রাথমিক সেবার আওতায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি। রোগীরা যখন একদম মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে, তখন তারা হাসপাতালে যাচ্ছে। সেখানে চিকিৎসা দিলে হয়তো মৃত্যু কিছুটা কমতে পারে, তবে ডেঙ্গু আক্রান্তরা যাতে গুরুতর অসুস্থতার দিকে না যায়, সেই দায়িত্বও কর্তৃপক্ষের নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি কেয়ারে তেমন কোনো পদক্ষেপ না থাকায় সংক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু বাড়াটাই স্বাভাবিক।’

তাৎক্ষণিক করণীয় তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে তৃণমূল পর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত রোগী শনাক্তকরণের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। ডেঙ্গু রোগী শনাক্তের জন্য তৃণমূল পর্যায়ে টেস্টিং সুবিধা পৌঁছাতে হবে। সরকার বিনামূল্যে ডেঙ্গু টেস্টের যে উদ্যোগ নিয়েছে তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়, তবে এই সুবিধাটি ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরির মাধ্যমে তৃণমূলের মানুষের দোরগোড়ায় সহজলভ্য করতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়েই মানুষ যদি জানতে পারে সে ডেঙ্গু আক্রান্ত, তবে সে অন্তত পরবর্তী ১০ দিন বিশ্রামে থাকবে। বিশেষ করে খেটে খাওয়া ও দরিদ্র মানুষরা খাওয়ার তাগিদে কাজ করে যান এবং 'কিছু হবে না' বলে নিজেদের সান্ত¡না দেন। ফলে কাজ করতে করতেই তারা একসময় অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় পড়ে যান এবং শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আসেন, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। তাই তৃণমূল পর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ ও রোগী শনাক্তকরণের মতো দ্রুত হস্তক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’

ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ এবং রোগী শনাক্তকরণের কাজ দুটিকে একসঙ্গে সমন্বিতভাবে চালাতে হবে। একইসঙ্গে কমিউনিটি লেভেলে ব্যাপক আকারে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করতে হবে। এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে রোগীর মোট সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং সবচেয়ে দ্রুত মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসবে।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে দেশজুড়ে ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ৮২৮ জনে। এ ছাড়াও গত একদিনে নতুন করে আরও ৯০৪ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ দেখা গেছে। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ১০৫ শিশুর শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে আরও ৭৯৯ শিশু। এর ফলে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত দেশে হাম ও এর উপসর্গে মোট ৮২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে ৯৫ জন এবং হামের উপসর্গে ৭৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৫২ জনের শরীরে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হামে আক্রান্ত হিসেবে নিশ্চিত হয়েছেন ১৫ হাজার ৬৫৬ জন। এ ছাড়া, চলতি প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১ লাখের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতর হামের সংক্রমণ রোধে শিশুদের নির্ধারিত টিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।