জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ক্যাম্পাসের ভেতরে রিকশা চালানোর লাইসেন্স বা অনুমোদন পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে চালকদের কাছ থেকে রিকশা প্রতি ১০ হাজার টাকা করে বিপুল অংকের চাঁদা আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই চাঁদাবাজির সঙ্গে সরাসরি শহীদ সালাম বরকত হল সংসদের ভিপি এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) ভিপির নাম উঠে এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে পরিবেশ বান্ধব অটোরিকশা অনুমোদনের জন্য ২য় ধাপে আবেদন গ্রহণের জন্য রিকশা মালিকদের থেকে আবেদন চায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এই সুযোগে জাকসুর ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু অটোরিকশার অনুমোদন দিবেন বলে রেফারেন্সে তিনি স্বাক্ষর করেন। এদিকে আব্দুর রশিদ জিতুর হয়ে রিকশা প্রতি দশ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন শহীদ সালাম বরকত হল সংসদের ভিপি মারুফ হোসেন। তবে মারুফ হোসেন নিজে না গিয়ে তারই হলের উচ্চমান সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর মো. মনির হোসেনকে পাঠান চাঁদার টাকা আনতে। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২০ জুলাই রাত সাড়ে নয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী ইসলামনগরের রনি চত্বর সংলগ্ন একটি মুদি দোকানের পেছনে গোপনে এই টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়। সেখানে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের একটি দল উপস্থিত থেকে রিকশাচালকদের কাছ থেকে চাঁদার টাকা আদায়ের দৃশ্যটি সরাসরি চাক্ষুষ করেন। চালকদের কাছ থেকে এই নগদ অর্থ গ্রহণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মচারী—উচ্চমান সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর মো. মনির হোসেন।

এদিকে টাকা লেনদেনের পরপরই কর্মচারী মো. মনির হোসেন চালকদের ফোন করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। মনির হোসেন চালকদের নির্দেশ দিয়েছেন কেউ জিজ্ঞেস করলে যেন বলা হয়— "আমি উনার কাছে টাকা পেতাম বা ধার নিয়েছিলাম, সেই টাকা দিয়েছি।" এছাড়া বিষয়টি নিয়ে কোনো ঝামেলা করার চেষ্টা করলে চালকদের রিকশা চালানোর অনুমোদন চিরতরে বাতিল করে দেওয়ার হুমকিও দেন তিনি।

অনুসন্ধানে উঠে আসে, চাঁদা আদায়ের এই প্রক্রিয়ায় শহীদ সালাম বরকত হল সংসদের ভিপি এবং রসায়ন বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মারুফ হোসেন সরাসরি জড়িত। কর্মচারী মনির হোসেন চালকদের আশ্বস্ত করে বলেন, "অফিসে গেলে বা কোনো রকম সমস্যা হলে বলবা সালাম বরকত হলের ভিপি মারুফ ভাই পাঠাইছে।" শুধু তাই নয়, চালকদের কাছে দাবি করা হয় যে, এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জাকসুর ভিপি আব্দুর রশিদ জিতুর সরাসরি হাত বা সম্পৃক্ততা রয়েছে।

মৌখিক নির্দেশনার পাশাপাশি রিকশা অনুমোদনের আবেদন ফর্মের নথিপত্রেও এর প্রমাণ মিলেছে। আবেদন ফর্মগুলো ঘেঁটে দেখা যায়, সেখানে রেফারেন্স বা সুপারিশকারী হিসেবে জাকসু ভিপি আব্দুর রশিদ জিতুর নাম ব্যবহার করা হয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার আঁচ পেয়ে একটি ফর্মের রেফারেন্স অংশে ফ্লুইড (কারেকশন পেন) দিয়ে ঘষে নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। তবে এরপরও নিচের লেখাটি স্পষ্টভাবে পড়া যাচ্ছিল। এছাড়া, অন্য আরেকটি আবেদনপত্রের এক কোণায় কলম দিয়ে "জিতু/জাকসু" লেখা পাওয়া যায়, যা এই সিন্ডিকেটের সাথে প্রভাবশালী ছাত্রনেতাদের নাম ব্যবহারের বিষয়টি আরও সুনিশ্চিত করে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কর্মচারী মো. মনির হোসেন টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, “আমি কোনো রিকশাওয়ালার কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিইনি। আমি ছোটখাটো চাকরি করি, এই ধরনের কোনো ভেজালের মধ্যে আমি নাই।”

​শহীদ সালাম-বরকত হল সংসদের ভিপি ও শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মারুফ হোসেন চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “মনির ভাই আমার কথা কেন বলেছে এটা আমি জানি না। তবে মনির ভাই একদিন আমাকে বলেছিলেন যে তাঁর পরিচিত একটি ছেলে আছে, তার জন্য রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করে দিতে। পরে আমি এস্টেট অফিসের কাশেম ভাইকে বলি। কাশেম ভাই জানান যে রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেছে, এখন আর সম্ভব না। পরে আমি বললাম, তাহলে তো আর কিছু করার নাই। এর বাইরে আমি আর কিছু জানি না।”

ফর্মে সুপারিশ করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন জাকসু ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু। তিনি বলেন, “আমাকে অনেকে অনুরোধ করেছেন, সেজন্য আমি সুপারিশ করেছি। আরও অনেকেই সুপারিশ করেছেন। কিন্তু টাকা-পয়সার লেনদেনের বিষয়টি আমার জানা নেই। আর কেউ লাইসেন্সের জন্য টাকা লেনদেন করলে তার লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে।”

​বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. আবুল কাশেম জাকসু ভিপির সুপারিশের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “এরকম সুপারিশ তো অনেকেই করেছেন। তবে আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে আমি অবগত নই।”

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, ”আমি এ বিষয়ে জানি না। খোঁজখবর নিয়ে দেখছি।”