বাংলা সাহিত্যের নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রোববার গাজীপুরের পিরুজালী এলাকার নুহাশপল্লী পরিণত হয় ভক্তদের এক আবেগঘন মিলনমেলায়। সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো ভক্ত, পাঠক, কবি, সাহিত্যিক, নাট্যজন ও সংস্কৃতিকর্মীরা নুহাশপল্লীতে এসে তাঁর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। দিনব্যাপী কোরআনখানি, দোয়া, মিলাদ মাহফিল, স্মৃতিচারণ, এতিমদের খাবার বিতরণ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও স্মরণমূলক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রিয় লেখককে স্মরণ করা হয়।
দুপুরে হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিতকে সঙ্গে নিয়ে সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন ও কবর জিয়ারত করেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, গত ১৪ বছর ধরে নুহাশপল্লীর কর্মী, পরিবারের সদস্য এবং ভক্তদের উদ্যোগেই জন্মদিন ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'সরকার বা রাষ্ট্রের কাছে আমার কোনো চাওয়া নেই। আগে কিছু আশা ছিল, এখন সেটিও নেই। যতদিন আমরা, আমাদের সন্তানরা, নুহাশপল্লীর কর্মী ও ভক্তরা থাকব, ততদিন হুমায়ূন আহমেদকে স্মরণ করে যাব।'
মৃত্যুবার্ষিকীতে নুহাশপল্লীতে একটি উন্মুক্ত লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার দাবি জানান অনেক ভক্ত। এ বিষয়ে শাওন বলেন, 'নুহাশপল্লীতে বইয়ের সংগ্রহ রয়েছে, তবে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত লাইব্রেরি করা হয়নি। কয়েকবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু অনেকেই বই নিয়ে আর ফেরত দেন না। এমনকি হুমায়ূন আহমেদের প্রথম সংস্করণের মূল্যবান বইও হারিয়ে গেছে। তাই আপাতত উন্মুক্ত লাইব্রেরি করার পরিকল্পনা নেই। প্রকৃত পাঠক ও ভক্তরা তাঁর বই নিজেরাই সংগ্রহ করবেন।'
সকাল থেকেই নুহাশপল্লীর লিচুতলায় ছিল মানুষের উপচেপড়া ভিড়। কেউ ফুল হাতে, কেউ নীরবে সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে প্রিয় লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। অনেক ভক্তকে হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় চরিত্র 'হিমু'-র হলুদ পাঞ্জাবি এবং 'রূপা'-র নীল শাড়ির সাজে দেখা যায়, যা পুরো আয়োজনকে উৎসবমুখর ও ব্যতিক্রমী আবহ এনে দেয়।
ভক্তদের অনেকেই বলেন, হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিবিজড়িত নুহাশপল্লীতে একটি আধুনিক পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা হলে দেশ-বিদেশের পাঠকরা তাঁর সাহিত্য পাঠ ও গবেষণার সুযোগ পেতেন। একই সঙ্গে তাঁর নাটক, চলচ্চিত্র ও দুর্লভ প্রকাশনাগুলোও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মত দেন তারা।
হুমায়ূন আহমেদের ভক্ত সংগঠন 'হিমু পরিবহন'-এর সদস্যরা জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও তারা সংগঠিতভাবে নুহাশপল্লীতে এসে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। ভবিষ্যতেও ক্যান্সার সচেতনতা কর্মসূচি, ম্যারাথন, হিমু-রূপা উৎসবসহ বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে প্রিয় লেখকের স্মৃতিকে ধরে রাখার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
নুহাশপল্লীর ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বুলবুল জানান, মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সকাল থেকেই আশপাশের মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীদের দিয়ে পবিত্র কোরআন খতম, দোয়া ও মিলাদের আয়োজন করা হয়। পরে মেহের আফরোজ শাওন, তাঁর দুই ছেলে, পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীরা কবর জিয়ারত ও বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন।
উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী গাজীপুরের নুহাশপল্লীতেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুর ১৪ বছর পরও তাঁর সাহিত্য, সৃষ্টি ও স্মৃতির প্রতি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে নুহাশপল্লীতে ভক্তদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির মাধ্যমে।