• ৬১ জন হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে
  • ২১ জুলাই ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ দাখিল
  • হেফাজতকে নিঃশেষের পরিকল্পনা থেকেই শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞ: চিফ প্রসিকিউটর
  • রাষ্ট্রীয়ভাবে শাপলার শহীদদের লাশ গুমের অপচেষ্টা হয়েছিল: মামুনুল হক

২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনকে আসামী করে তদন্ত প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে জমা দিয়েছে তদন্ত সংস্থা।

গতকাল রোববার সকালে তদন্ত সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদনটি জমা দেয়।

মামলার প্রধান আসামী করা হয়েছে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। এছাড়া আসামীদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ ও এ কে এম শহীদুল হক, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং তৎকালীন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনারসহ আরও কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা।

তদন্ত প্রতিবেদনে তৎকালীন সরকারের সহযোগী ও উসকানিদাতা হিসেবে একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবু, সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপা এবং ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাবেক সভাপতি শাহরিয়ার কবীরের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রসিকিউশনের কাছে পৌঁছেছে এবং তা বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আগামী ২১ জুলাই এটি ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করা হতে পারে।

তিনি বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনাটি একটি পদ্ধতিগত অপরাধ। এটি ছিল ব্যাপক ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড সুপিরিয়র রেসপনসিবলিটি রয়েছে। একদম পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। কারণ যখন ব্লগারদের বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ করছিলেন, ঠিক তখনই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে এই সংগঠনটিকে একেবারে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য নানা পরিকল্পনা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এমন হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, নারকীয় হত্যাকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তদন্ত শেষে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে একটি খসড়া প্রতিবেদন দাখিল করেছেন তারা। প্রতিবেদনটি এখন পর্যালোচনা বা চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই করা হবে। যেন একটি সঠিক তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে স্বচ্ছ বিচার হয়। প্রকৃত আসামীরা যেন বিচারের সম্মুখীন হন। এজন্য হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে খসড়া প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করেছি। শিগগিরই পূর্ণ প্রতিবেদন হাতে পাবো বলে আশা করছি।

আসামীদের তালিকায় কারা রয়েছেন জানতে চাইলে আমিনুল ইসলাম বলেন, এই প্রতিবেদনটি খসড়া। চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগ পর্যন্ত আসামীদের তালিকা আমরা প্রকাশ করতে পারছি না। তবে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ মামলার প্রধান আসামী। তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। এছাড়া সাবেক পুলিশপ্রধান, বিজিবি প্রধানসহ কয়েকজনেন বিরুদ্ধে খসড়া প্রতিবেদন এসেছে। এসব আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখব।

তিনি আরও বলেন, খসড়া প্রতিবেদন হওয়ায় যাচাই-বাছাই শেষে আসামীদের নাম সংযোজন-বিয়োজন হতে পারে। হেফাজত ইসলামের নেতারা এ ঘটনার জ্বলন্ত বা প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তারা এ বিষয়ে আরও বেশি ওয়াকিবহাল রয়েছেন। আমাদের তদন্তের ওপর তাদের আর কোনো বক্তব্য থাকলে নিশ্চয়ই বলবেন। তবে কে আসামী হবেন, আর কে হবেন না; তা ফরমাল চার্জ দাখিলের পরই সবাই জানতে পারবেন।

নিহতদের তালিকা প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমরা এ পর্যন্ত নিহত প্রায় ৬১ জনের একটি তালিকা পেয়েছিলাম। কিন্তু ৫৮ জনের পরিচয় এরই মধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। বাকিদের এখনও সম্ভব হয়নি। তবে আমাদের তালিকা ৬১ জনের।

এদিকে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে রোববার সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে যান হেফাজতে ইসলামের একটি প্রতিনিধি দল

সংগঠনের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল হামিদের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক, মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি মীর ইদ্রিসসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তারা দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।

রাষ্ট্রীয়ভাবে শাপলার শহীদদের লাশ গুমের অপচেষ্টা হয়েছিল: মামুনুল হক

রাজধানীর শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে শহীদ হওয়া অনেকের লাশ গুমের অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল বলে দাবি করেছেন সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হক।

গতকাল রোববার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।

মামুনুল হক বলেন, শুধুমাত্র নিহত যাদের তথ্য সংগ্রহ করা গেছে, তদন্তে তাদের সংখ্যাটি এসেছে। কিন্তু আমরা প্রথম থেকেই বলছি যে, অনেকেরই লাশ পাওয়া যায়নি। কাজেই সেসব তথ্য এখানে আনার সুযোগ নেই। কারণ রাষ্ট্রীয়ভাবে তৎকালীন সময়ে শাপলার শহীদদের লাশ গুম করার অপচেষ্টা হয়েছিল। এজন্য বহুসংখ্যক শহীদের কোনো হদিস মেলেনি।

তিনি বলেন, শাপলা চত্বরের মহাসমাবেশে সমাজের সব শ্রেণির মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। শিক্ষার্থী, শ্রমিকসহ তৎকালীন প্রায় সব বিরোধী ঘরানার রাজনৈতিক দলের কর্মীরাও শহীদের তালিকায় রয়েছেন। কেননা আন্দোলনটি সার্বজনীন ছিল।

তদন্তের খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে এই হেফাজত নেতা বলেন, এখন পর্যন্ত খসড়া প্রতিবেদনটি বিস্তারিত দেখিনি। প্রাথমিকভাবে যতটুকু দেখেছি, তাতে কিছু সংশোধন রয়েছে আমাদের। আমরা আরেকটু পর্যালোচনা করে দু-একদিনের মধ্যেই সংশোধনের কথাগুলো প্রসিকিউশনকে বলবো। এরপর সন্তুষ্ট কতটুকু হয়েছি, তা বলতে পারবো।

আপনাদের এক্সপেক্টেশন কী ছিল? কোনটার সঙ্গে আপনাদের দ্বিমত হচ্ছে?Ñসাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, মামলাটি তদন্তাধীন বলে আগেই জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদন এখনও দাখিল হয়নি। এ পর্যায়ে সব বিষয় উন্মুক্ত করাও সম্ভব নয়। অতএব আমাদের যে অভিযোগ ছিল, সে অনুযায়ী এ খসড়া প্রতিবেদন অনেকটা কাছাকাছিই রয়েছে বলে আমরা মনে করি।

শাপলা চত্বরে হত্যাযজ্ঞ মামলার তদন্তে কোনো চাপ ছিল না: তদন্ত কর্মকর্তা

তদন্ত কর্মকর্তা ইফতেখারুল আলম বলেছেন, শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ ঘিরে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্তে কাউকে বাদ দেওয়া বা কারও নাম নতুন করে যুক্ত করার ব্যাপারে আমাদের ওপর কোনো ধরনের চাপ ছিল না। আমাদের তদন্তের পদ্ধতি পুরোপুরিই ভিন্ন। শুরু থেকেই আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রসিকিউশন। কে আসামী হচ্ছেন, কেন হচ্ছেন- এসব বিষয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগকারী তথা হেফাজতে ইসলামের নেতারা সন্তুষ্ট। দু-একটি ব্যাপারে সংশোধন থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৫ মে ১৩ দফা দাবিতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করে হেফাজতে ইসলাম। ওই দিন সংঘর্ষের পর রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানকে কেন্দ্র করে বহু হতাহতের অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনাকে ঘিরেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটির তদন্ত চলছে।